মেনু নির্বাচন করুন

খাল ও নদী

নদীবিধৌত প্রাচ্যের রহস্য নগরী সোনারগাঁয়ের অমূল্য সম্পদ হলো নদ নদী, প্রাচীন ব্রহ্মপুত্র, মেঘনা, শীতলক্ষ্যা মেনিখালির তীরে বৈদিক যুগ থেকেই উপমহাদেশ খ্যাত লোকজ শিল্পের সমৃদ্ধ পদচারনার উম্মেষ হয়েছিল। প্রদোষকালের সেই বর্নাঢ্য লোকজ শিল্প সম্ভারের কিয়দংশ এখনো টিকে আছে। প্রাচীন কালিকাপুরান খ্যাত পরশুরামের স্মৃতি বিজড়িত হিন্দুদের তীর্থ স্থান লাঙ্গলবন্দ ঝিনুক শিল্পের গৌরবজ্জল রশ্মির শেষ রশ্মি এখনো প্রোজ্জলিত। লাঙ্গলবন্দে স্বামী বিবেকানান্দ, মহাত্মা গান্ধী, নেহেরুর দেহভস্ম এখনো রক্ষিত। পুরাতন ব্রহ্মপুত্র বিধৌত এ জনপদের একটি উল্লেখযোগ্য ভূমিকা ছিল ঝিনুক সংগ্রহ, বাজার জাতকরন এবং ঝিনুক দ্রব্যাদি উৎপাদন ও রফতানিকরন। ঝিনুক থেকে উৎপাদিত মুক্তা, বোতাম, চুন কে ঘিরে একসময় সমৃদ্ধ অর্থনীতির সূচনা হয়েছিল যার রেশ ছিল গত শতাব্দির শেষ প্রান্ত পর্যন্ত। ঝিনুকের বোতাম, মুক্তার কথা বর্ণিত আছে চীনের মিঙ সম্রাটের ইতিহাসে। চৈনিক পরিব্রাজক কংছুলো, মাহুয়ান, ফাহিয়েন নদ নদী খাল বেষ্টিত রহস্য নগরী সোনার গাঁকে বোতাম, ছুরি, কাঁচি এবং তুলোট কাগজের উৎপাদিত শহর হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তা থেকে ধারনা করা যায় চৈনিক পরিব্রাজকরা ব্রহ্মপুত্রের তীরে লাঙ্গলবন্দ, অলিপুরা, মহজমপুর, কাঁচপুর এ জনপদকে ঘিরে এ শিল্পের পদচারনা দেখেছিলেন যা তাদের ইতিহাসে তা বর্ননাও করে গেছেন। পঞ্চমীঘাট হিন্দুদের আরেক তীর্থস্থান। পশ্চিমে দেওয়ানবাগ এবং কুতুবপুরে বারো ভূইয়াদের দূর্গ ছিল এবং দেওয়ান বাগের দিঘী থেকেই ইংরেজ ম্যাজিস্ট্রেট জন স্টিপেলটন ঈসা খাঁর নির্মিত নয়টি কামান উদ্ধার করেন যা এখনও ঢাকা জাদুঘরে রক্ষিত আছে। ব্রহ্মপুত্র পারের সভ্যতার প্রানকেন্দ্র লাঙ্গলবন্দ, অলিপুরা ও মহজমপুর নগর বন্দরে ঝিনুক শিল্পের বড় বড় আড়ত ছিল। গত শতকের শেষ দিকেও ঝিনুক ব্যবসায়িদের পদচারনা কিয়দংশ ছিল। এখন প্রায় বিলুপ্ত। আমরাই আমাদের শেশব ও কৈশোর কালে দেখেছি ব্রহ্মপুত্রের তীরে ঝিনুকের বিশাল স্ত্তপ। এ সমস্ত ঝিনুক ফাগুন ও চৈত্র মাসে সংগ্রহ করা হতো। এবং এ ঝিনুকের মুক্তা সংগ্রাহক ছিল যাযাবর শ্রেণীর লোক প্রসঙ্গতই বেদে সম্প্রদায়। ব্রহ্মপুত্র, মেনিখালি থেকে ঝিনুক সংগ্রহের জন্যে শত শত বেদে নৌকা এ নদ নদীতে সমবেত হতো। বেদেরা উত্তরে হরিহরদি, মহজমপুর, ধন্দির নদী থেকেও ঝিনুক সংগ্রহ করে নদীর তীরে স্ত্তপকৃত করে রাখতো। সংগৃহীত ঝিনুক লাঙ্গলবন্দের আড়তদারদের নিকট তা বিক্রী করতো। আমরাও কিশোর বয়সে নদী থেকে ঝিনুক সংগ্রহ করে বাড়ীতে এনে তা ফাটিয়ে তার ভেতর থেকে মুক্তো আহরনের ব্যর্থ চেষ্টা করতাম।

          গরীব ও মধ্যবিত্ত লোকদের ঝিনুকের খোসা গুলোকে চামচ হিসেবেও ব্যবহার করতে দেখেছি। এই ঝিনুক থেকে মুক্তো আহরনের জন্য এক বিশাল পেশাদারি গোষ্ঠী গড়ে ওঠেছিল ব্রহ্মপুত্র পারের সভ্যতায়। বেদেরা ঝিনুক থেকে মুক্তো আহরন করে ঝিনুকের খোসাগুলো বন্দরে, বাজারে মহাজনদের নিকট বিক্রী করে দিত। মহাজনদের কাছ থেকে দরীদ্র লোকজন সে খোলস গুলো কিনে নিয়ে যেতো। দরীদ্র গৃহবধু ও মেয়েদের কাজ ছিল সুপারি কাটার মতো ছোরতা দিয়ে তা কেটে বোতামের আকৃতি দেয়া এবং এক প্রকারের মেসিনের সাহায্যে বোতামে ছিদ্র করা হতো। এই বোতামগুলোকে মোটা কাগজে বান্ডিলকরে স্থানীয় হাটে অথবা ঢাকার সূত্রাপুর ও সদরঘাটে বিক্রী করা হতো। সোনারগাঁয়ের ব্রহ্মপুত্রনদ অববাহিকার উৎপাদিত ঝিনুক সামগ্রীর বিশাল বানিজ্য ক্ষেত্র ছিল ঢাকার সূত্রাপুর এবং সদরঘাটে। সূত্রাপুর এবং সদরঘাট থেকে ক্রেতারা এই ঝিনুকের বোতাম সংগ্রহ করে তা ভারতের কোলকাতায় চালান করতো। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্তির ফলে এ বোতাম ভারতে পাঠানো দূঃসাধ্য হয়ে পড়ে, পরে প্লাষ্টিকের সহজলভ্য বোতাম বাজারে আমদানির ফলে ঝিনুক শিল্প চরম দুরাবস্থায় পতিত হয়। একমাত্র ঝিনুক থেকে দুর্লভ মুক্তো আহরনের পেশাদারী সম্প্রদায়ের গুটিকয় পরিবার এখনো টিকে আছে। পরবর্তী পর্যায়ে এ ঝিনুক শিল্পের শৈল্পিক দিক যেমন ঝিনুকের তৈরী ফুল, লতা, পাতা, চুলের বাধুনি এ নান্দনিক শিল্পের সম্প্রসারন করার কোন উদ্যোগ গ্রহণ না করার ফলে এ সমৃদ্ধ শিল্পের অপমৃত্যু ঘটে। ঝিনুকের খোসা প্রায় সবটাই ক্যালসিয়াম কার্বোনেট। যা পুড়িয়ে চুন হিসেবে ব্যবহৃত হতো।